বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার

বাবা-মায়ের বড় আদরের সন্তান ছিলেন সুমন শিকদার (২৪)। বাবা আনোয়ার শিকদার একটি ভবনের কেয়ারটেকার হিসেবে চাকরি করেন। আর সুমন একটি প্রাইভেট  কোম্পানিতে চাকরি করে বাবার সঙ্গে পরিবারে অর্থের যোগান দিতেন। বাবা-মা আর দুই বোনকে নিয়ে বেশ ভালই চলছিলো তাদের সংসার। একমাত্র ছেলে হওয়াতে বাবা-মায়ের সব স্বপ্নই ছিল সুমনকে ঘিরে। কিন্তু সিটি নির্বাচনের রাতে আকস্মিক এক হামলায় সুমনের পরিবারের সব সুখ,আশা ও স্বপ্নগুলো মিইয়ে গেছে। দুর্বৃত্তদের হামলায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন সুমন। আর এই শোক কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না তার পরিবার।

স্বজনরা কিছুতেই তাদের শান্তনা দিতে পারছেন না। তাদের চোখে মুখে হতাশার চাপ। সুমনের মা বোনের চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে।

নিহত সুমন শিকদারের বন্ধু ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সিটি নির্বাচনে উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ঠেলাগাড়ি নিয়ে নির্বাচিত কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্টনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সুমন শিকদার। সুমনের বন্ধুরা দাবি করছেন তিনি ঠেলা গাড়ি প্রতিকের পোলিং এজেন্ট ছিলেন। ভোটের দিন তিনি লালমাটিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সারা দিন সেখানেই ছিলেন। সন্ধ্যায় ভোট গণনা শেষে বাসায় গিয়ে নাস্তা করেন। কিছুক্ষণ পরে তার মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। এরপর তিনি বাসা থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রায়ের বাজার রহিম বেপারি ঘাটের দিকে চলে যান। সেখানে তারা ছয় বন্ধু সাজ্জাদ, রুবেল, আল আমিন, ইমরান (দুইজন) ও সুমন মিলে নির্বাচনী গল্প করছিলেন। এসময় হঠাৎ করে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় মারাত্বকভাবে আহত হন সুমন। পরে তাকে উদ্ধার করে আনা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলে থাকা সুমনের বন্ধু সাজ্জাদ জানান, আমরা যখন গল্প করছিলাম তখন মুখে মাস্ক পরিহিত ৩০/৪০ জন যুবক এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। মুখে মাস্ক থাকায় হামলাকারীদের চিনতে পারি নাই। তবে হামলাকারীরা ৩৩ নং ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা শাহ আলমের লোক কে কে আছে বলে তারা হামলা চালিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সুমনের বুকের ডান পাশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। এই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তার পেটে পায়ে ও পিঠসহ শরীরের বেশ কয়েকটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

নিহত সুমন শিকদারের বাবা আনোয়ার শিকদার লালমাটিয়ার এফ ব্লকের ৪/২ নম্বর বাসায় কেয়ারটেকার হিসেবে চাকরি করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুর জেলার রামগতিতে। যে বাসায় তার বাবা চাকরি করেন ওই বাসায় নিচ তলায় তারা সবাই মিলে থাকেন। গতকাল লালমাটিয়ার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সবাই মিলে আহাজারি করছেন। আহাজারি করে করে সুমনের মা ঝুমুর বেগম বলছিলেন, আমার বুকটা খালি করে দিল। এখন আমি কি নিয়ে বাচমু। আমার ছেলের কি দোষ ছিল। নাস্তা খেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে আর ফিরে এলো না। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। সুমনের বোন সুর্বণা বলেন, আমার ভাই একটি প্রাইভেট চাকরি করতো। কিছু দিন আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিল। একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট হিসেবে ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করেছে। সবকিছু শেষে বাসায় এসে সে নাস্তা করে। এক বন্ধুর ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে খবর আসে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় আমার ভাইকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কথা বলতে পারছে না। আমার অনেক ডাকাডাকি করেছি কিন্তু সে আর জেগে উঠেনি। সুমনের আরেক বোন সুইটি বলেন, রাতের খাবার একসঙ্গে খাওয়ার জন্য রাত ৯টায় আমি ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফোন ধরে নাই। পরে খবর আসে ভাইকে কারা কুপাইছে। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আমরা হাসপাতালে গিয়ে দেখি ভাই আর নাই।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন, এ ঘটনায় নিহতের পরিবার একটি একটি হত্যা মামলা করেছে। আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের উপ পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুদকদার বলেন, কারা কোন উদ্দেশ্য হামলা করেছে আমরা বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি। তদন্ত চলছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি