মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন

তরুণ সমাজকে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই : অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী

নোয়াখালী জেলায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা, জেলার কৃতি সন্তান অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭৮ সালে জেলার প্রাণ কেন্দ্র মাইজদীর ঐতিহ্যবাহী অরুণ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৮০ সালে নোয়াখালী সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে ভর্তি হন এবং প্রথম শ্রেণীসহ স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের সূত্রপাত ঘটে। সহকারী অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত থাকার মধ্যেই ১৯৯২ সালে এমএস এবং পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থিত নর্থইষ্টার্ণ ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯৬ সালে ‘অপারেশন রিসার্চ’ বিষয়ে এমএস এবং ১৯৯৯ সালে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে নর্থ ইষ্টার্ণ ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে (১৯৯৯-২০০১) শিক্ষকতা করেন। তিনি ২০০১ সাল হতে ২০০২ সাল পর্যন্ত কানাডায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরিতে, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পরিসংখ্যান’ বিষয়ের উপর পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণা সম্পন্ন করে। অতঃপর ২০০২-২০০৫ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসরে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। বাংলাদেশে এসে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ প্রোগ্রাম পরিচালক, সিপিডিএস পরিচালক, ডীন স্কুল অব বিজনেস, নির্বাহী পরিচালক, সিন্ডিকেট সদস্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকায় ইস্টার্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রো-ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সাল থেকে বর্তমানে তিনি প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও চীনের ইউনান নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। এই পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত ২টি বইসহ ৬০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কি-নোট স্পিকার, পেনালিস্ট, প্রেজেন্টার হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, স্নোভাকিয়া, চেক-রিপাবলিক, হাঙ্গেরি, মালেয়শিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, তাইওয়ান, কম্বোডিয়া, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ. পাকিস্তান, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব, কাতারসহ প্রায় ৪০টি দেশে তিনি শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে ভ্রমন করেছেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বহু অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যান্ট অর্জন করেন।

তাঁর এই উচ্চ শিক্ষার বর্ণাঢ্য জীবনে শিক্ষার দর্শন, গুণগত শিক্ষা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট, সমসাময়িক বিষয়গুলো তিনি প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে ধরেছেন ‘দৈনিক বাঙলার জাগরণ’র সাথে। সাক্ষাৎকার গ্রহণে পাপেল কুমার সাহা…

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : জাতিসংঘ ঘোষিত টেকশই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রায় ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৪ নম্বরে গুণগত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আপনি এই গুণগত শিক্ষা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : আমরা সকলেই জানি যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরে জাতিসংঘ এখন সারাবিশ্বে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশ্বের সকল দেশকেই ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ‘গুণগত শিক্ষা’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা যদি বলি, তাহলে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সকলের প্রত্যাশা বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমি শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত একজন মানুষ হিসেবে মনে করি আমরা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবো না, যতদিন পর্যন্ত তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আমরা গুণগত শিক্ষা না দিতে পারি। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করণের জন্য এখন সর্বস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদেরকে বিশ্বমানের শিক্ষাদানের একটা প্রচেষ্টা করতে হবে। আগামী দিনে আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প খাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব আসছে বলে, আমরা সবাই বলছি। যেখানে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই তা ইতোমধ্যেই বাস্তবতায় রুপ নিয়েছে। আগামী প্রজন্মকে আমরা যদি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানসম্মত শিক্ষা দিতে না পারি তাহলে আমাদের তরুণ সমাজ বিশ্বের বাজারে কোন ভাবে স্থান করে নিতে পারবে না। সেই কারণে আমাদের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটা স্তরেই আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম সংযোজিত সিলেবাস এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি স্তরে সঠিক গুনাবলী সম্বলিত ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা যেন আনতে পারি সমাজের নিম্ন স্তর থেকে উপরের স্তরে, যারা বর্তমান বিশ্বের প্রয়োজনে যে দক্ষতা ও জ্ঞান দরকার, সেটা অর্জন করতে পারে। দুঃখের বিষয় হল যে, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন স্তরেই আমরা সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি। আমরা এখনও যে কারিকুলাম, শিক্ষক এবং শিক্ষা পদ্ধতি দিয়ে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদান করি, সেটা বিশ্বের যে কোন উন্নত দেশের তুলনায় অনেকাংশে পিছিয়ে আছে। এতে আমি বলবোনা যে, আমাদের সরকারী কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনটি এগিয়ে আছে। সার্বিকভাবে আমাদের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ই বৈশ্বিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হয় তবে আমাদেরকে যেটা করতে হবে তা হচ্ছে, শিক্ষাঙ্গনে মেধাবীদেরকে আনতে হবে। শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যে যারা সম্পৃক্ত থাকবে, তারা প্রকৃত অর্থে শিক্ষানুরাগী এবং মেধার বিবেচনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের হতে হবে। সুতরাং সামগ্রিকভাবে একটি শিক্ষানুরাগী পদ্ধতি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সংযোজন করতে হবে, যাতে করে শ্রেণীকক্ষে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য, যে ধরনের শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন সেটা আমরা নিশ্চিত করতে পারি। আমরা বাংলাদেশকে বলছি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ তথা দেশ ডিজিটাল ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে আমরা সেরকম কোনো পরিবর্তন এখনও লক্ষ্য করিনি।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব জায়গায়ই STEM সম্বলিত শিক্ষা তথা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশল এবং গণিত বিষয় গুলোকে শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে এবং একটি ছাত্রের ছোটবেলা থেকেই সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। যদি আমরা গুণগত শিক্ষার কথা চিন্তা করি, সে ক্ষেত্রে আমরা সার্বিক ভাবে পিছিয়ে আছি। প্রশ্ন হলো যে, কিভাবে শিক্ষার সর্বস্তরে গুণগত শিক্ষা অর্জন করতে পারি? আমাদের শিক্ষার নিম্ন স্তর থেকে কাজ করতে হবে সব জায়গায় গুন নিয়ন্ত্রন নিশ্চিত করে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা এখনও তা নিশ্চিত করতে পারিনি। গুণগত শিক্ষার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বাজেট তথা প্রচুর অর্থের যোগান দিতে হবে। মেধাবী ছাত্র ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষক এবং মেধা প্রমোট করে এমন ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বর্তমান যুগের সাথে সময়োপযোগী বই-পুস্তুক, প্রযুক্তি, ল্যাব, বিজ্ঞানাগার এগুলোর সবই আধুনিক মানের হতে হবে। শিশুদের, তরুণদের মানসিক বিকাশের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে সহশিক্ষা এবং শিক্ষা বহির্ভূত কার্য সংযোজন করা হয় সেগুলো আমাদের প্রমোট করতে হবে। এগুলো যদি আমরা প্রমোট না করতে পারি, তাহলে কখনই আমরা ঐ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারব না।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অতিপরিচিত একটি শব্দ মেধা পাচার বা Brain Drain। এই ব্যাপারটি নিয়ে নানা জনের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ দেখা যায়। মেধা পাচারের কারণে বাংলাদেশ কি তার সম্ভাবনা হারাচ্ছে? স্যার এ ব্যাপারে আপনার দর্শন কি?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : মেধা পাচারের বিষয়টি নিয়ে আমার একটু অন্য ধরনের যুক্তি আছে। আমি একদিকে এটা স্বীকার করি কোন মেধাবী তরুণ যখন দেশ থেকে চলে যায়, সে যদি দেশে ফিরে না আসে তাহলে অবশ্যই Brain Drain হচ্ছে। অন্যদিকে আমি যখন এর উল্টো চিত্রটা দেখি তখন আমার কাছে লক্ষণীয় হয় আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে ভঙ্গুর, পশ্চাৎপদ, সনাতন, সময়োপযোগী না, অনেকাংশে একটা সার্টিফিকেট দেওয়ার উপর নির্ভরশীল। একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটা গ্র্যাজুয়েটকে সার্বিকভাবে তৈরি করে বের করা যাতে, সে কর্মক্ষেত্রে বা জীবনের অন্যক্ষেত্রে তার অর্জিত জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারে। আমাদের দেশে সেই সুযোগটা নেই বলে তরুন ছাত্রছাত্রীরা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা সকল শিক্ষার্থীকে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনভাবে ধারণ করতে পারছি না। একটা পরিবার ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে যে স্বপ্নদেখে সেটা পূরণে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনভাবে সহযোগীতা করতে পারছে না। তখনই কিন্তু কিছু কিছু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী দেশের বাইরে চলে যাবার প্রচেষ্টা করে। আমি মনে করি সেটা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর না। জ্ঞান আহরণের জন্য, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য, আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য অথবা অ্যাডভান্স মডার্ন এডুকেশন-এর জন্য উন্নত দেশে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা ছড়িয়ে গেলে পরবর্তীতে তারা নতুন জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার এদেশে চলে আসলে বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে অনেক দক্ষ মানব শক্তি ফিরে পাবে এবং যারা এই দেশে এসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করবে, তাদের কর্ম দিয়ে আমরা আগামী দিনের বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবো।

সে ক্ষেত্রে এটা Brain Drain না হয়ে, বরং Brain Drain হচ্ছে বলে আমরা মনে করতে পারি। যে ছাত্রটি বাংলাদেশে থাকলে মেধার বিকাশ আর হতোইনা অথবা সে খুব বেশী এগুতে পারতো না, একটা পর্যায়ে গিয়ে হতাশ হয়ে যেত এবং চাকরি, কর্মক্ষেত্রে কিংবা সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাকে হতাশাব্যঞ্জক বলে বিবেচিত করা হতো। আমাদের সামাজিক অবস্থানে যে আর এগুতে পারছে না, যার মেধা বিকাশের কোন জায়গা নেই, নতুন জ্ঞান আহরণের জায়গা নেই, তাহলে তার জন্য এখানে থেকে আসলেই একটা সাধারণ মানবসম্পদ হিসেবে পরিণত হওয়া ছাড়া তার আর কোন পথই নেই। জ্ঞান আহরণের জন্য কোন একটা ব্যক্তির বিদেশে যাওয়া বা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়াটাকে কেউ খারাপভাবে নেওয়াটা আমাদের মনে হয় উচিত হবে না। জ্ঞান আহরণ এবং জ্ঞান বিতরণের এর মধ্য দিয়েই জ্ঞানের প্রদীপ একটা ব্যক্তি থেকে আরেকটা ব্যক্তি, একটা সমাজ থেকে আরেকটা সমাজে, একটা প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটা প্রতিষ্ঠানে অথবা একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উপরের স্তর থেকে নিম্ন স্তরে যাবে। সে ভাবেই কিন্তু সমস্ত প্রতিষ্ঠান, সমাজ, দেশ এগিয়ে যাবে। আমাদের দেশের নেতিবাচক দিক হলো, এখন পর্যন্ত আমাদের সেই মেধাবী প্রজন্মকে কোন ভাবে আমরা দেশে ফিরে আনতে পারছি না। আমাদের দেশে চাকুরীর সুযোগ, কর্ম ক্ষেত্রের সুযোগ কিংবা সামাজিক অবস্থান সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভালো আয় এবং সুন্দর একটি জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া তা আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারছি না। ফলে কিছু কিছু অর্থে এদেশ থেকে সত্যিই মেধা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশকে সেরকম একটা ব্যবস্থায় যেতে হবে যাতে একজন মেধাবী তরুণ শিক্ষিত এবং অভিজ্ঞতা লব্ধ মানবসম্পদ দেশে যদি ফিরে আসতে চায় তবে রাষ্ট্র তার জন্য পথটা সুগম করে দিবে। দুঃখের সাথে বলতে হয়, আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই প্রজন্মকে দেশের কোন জায়গায় স্থান করে দেওয়া হয় না। ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, কোরিয়া এবং তুরস্কের যে নাগরিক বহির্বিশ্বে আছে তাদের জন্য রাষ্ট্রের ভেতর ইতিবাচক আহবান রয়েছে, আসতে চাইলেই তারা আসতে পারেন এবং তারা যদি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-প্রযুক্তি নিয়ে আসতে চায়, তাদের জন্য রাষ্ট্র সেই সুযোগটা করে দিচ্ছে। ফলে মেধা পাচারকে আমাদের ঐভাবে দেখা উচিত না। যে মেধাটা এখানে বিকশিতই হতো না, সে মেধাটা অন্য জায়গায় বিকশিত হচ্ছে বলে আমার কাছে সেটা মনে হয় Brain Drain অথচ সে এদেশে থেকে কিন্তু একটা সুপ্ত অবস্থায় কোন অবদান না করেই একটি সাদামাটা জীবন পালন করে যেতে পারে। অন্যদিকে তারা বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে মানবতার সাহায্য করতে পারে যা কিন্তু স্থানীয়ভাবে দেশের জন্যে কোন কল্যাণ বয়ে আনতো না সেটাকে আমি Brain Drain হিসেবে না দেখে Brain Drain হিসেবেই দেখি। বাংলাদেশ এমন একটা জাতি যাদের মানবসম্পদ একটা বড় শক্তি। সরকার আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়, দেশের সার্বিক উন্নয়নে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে আমরা কিন্তু Brain Drain করতে পারব এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ আমার নেই।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : ১৯৭৩ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ আইনে শিক্ষকের শিক্ষাদান এবং গবেষণা এই দুটো বিষয়ে জোরালোভাবে বলা হয়েছে। গবেষণাতে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি আপনার কাছে কেমন মনে হয়?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : আমরা যারা একটু মুক্তচিন্তার মানুষ, ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ আইনটি আমাদের শিক্ষকদেরকে এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রকে সামগ্রিকভাবে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে বলে মনে করি। অথচ ১৯৭৩ সনের অধ্যাদেশ আমাদের জন্য অনেক নেতিবাচক ধারণাও বয়ে এনেছে। এই নেতিবাচক প্রভাব আমরা বর্তমানে সর্বক্ষেত্রেই উপলব্ধি করছি। যখন আমি দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতাম, তখন এদেশে শুধুমাত্র ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো এবং এখন বাংলাদেশে ৪০টির মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও ১০০ টির উপরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকেই ১৯৭৩ সালের আইন দ্বারা পরিচালিত। এর মূল ধারণা হলো, একটা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তা, মুক্ত জায়গায় অবস্থান করে শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হবে যেখানে শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে গবেষণা করবে। সেরকম একটা মহৎ উদ্দেশ্য থাকার পরেও পরবর্তীতে সেটাকে আমরা রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একজন শিক্ষককে প্রভাষক পদ থেকে শুরু করে প্রফেসর পর্যন্ত একটা দলীয় ছত্রছায়ায় তাদের নিজের ক্যারিয়ার গড়া তথা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ইত্যাদি পদে নিয়োগ পেতে সাহায্য করছে। প্রকৃত অর্থে যারা গবেষণা করে তাদের জন্য তখন আর কোন পথ থাকে না। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার অপ্রতুল বরাদ্দ, অন্যদিকে যারা গবেষণা করে বা করতে পারে সে মেধাবী শিক্ষকদের জন্য কোন সুযোগ নেই অর্থাৎ তাদের জন্য কোন রি-অ্যাওয়ার্ড নেই। অথচ যিনি রাজনীতি করেন, তিনি পড়াশুনা এবং গবেষনা না করলেও অনেক উপরে চলে যেতে পারেন। যিনি গবেষণা করেন, ভালো পড়াশুনা করেন, যিনি ভালো পড়ান তার কিন্তু মূল্যায়ন আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নেই। এটা একটা নেতিবাচক দিক। আমাদের ১৯৭৩ সালের আইনটি, মূলত করা হয়েছিল শিক্ষকরা অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবে বলে, তাদের নিজেদের বলার অধিকার থাকবে এবং নিজেদের নেতৃত্ব দেবার সুযোগ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর ক্ষেত্রে কিন্তু সেটাও সবশেষে রাজনৈতিক রাহুর গ্রাসে পড়ে গিয়েছে ফলে উন্নত শিক্ষা প্রদান কিংবা গবেষণা করার সুযোগ ত্বরান্বিত হচ্ছে।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনার অভিমত কি?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : আমি গত ৩১ বছর ধরে শিক্ষাঙ্গনের সাথে জড়িত। কর্ম জীবনের শুরুতে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। আমেরিকার স্বনামধন্য প্রাইভেট ৯ ইউনিভার্সিটিতে, কানাডার নামকরা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে এবং বাংলাদেশে আসার পর থেকে নামকরা তিনটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির সাথে শিক্ষা প্রশাসনে কাজ করে আসছি। আমি সবগুলো শিক্ষা পদ্ধতির সাথে মোটামুটি ভাবে সম্পৃক্ত। আমাকে যদি আপনি বলেন, আপনার এই সুদীর্ঘ জীবনের শিক্ষকতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের সাথে জড়িত হওয়ার পরে বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনি কি ভাবছেন? এ প্রেক্ষিতে আমি সব সময় বলি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়, নানান ধরণের শিক্ষার মাধ্যমকে একটা জায়গায় আনার চেষ্টা হচ্ছে যা বাস্তবভিত্তিক না। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজী মাধ্যম, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এই সবকিছু মিলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটা জগাখিচুড়ি অবস্থানে আছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই নানান মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা উপরের দিকে উঠে আসে। আমেরিকার দিকে দেখেন, সেখানে ক্যাথলিক স্কুলে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে, এছাড়া মূলধারার ইংরেজি স্কুলও রয়েছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা যে মাধ্যমেই হোক না কেন, উপরের দিকে উঠে আসার সময় একটা ছাত্র-ছাত্রীর অর্জিত জ্ঞানের মাত্রা কোন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় না পৌছালে সমমানের ডিগ্রিটা দেয়া হয় না। একটি ছাত্রকে সমান্তরাল ভাবে এমন ভাবে এগিয়ে নিয়ে আসা হয় যাতে তার গুণগত মানে কোন ব্যবধান থাকেনা এবং মেধার তারতম্য খুব বেশি হয়না। পক্ষান্তরে সনাতন পদ্ধতিকে পরিবর্তন করে আমরা অন্য কিছুকে মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করতে গিয়ে জিপিএ বা সিজিপিএ সিস্টেম গ্রহন করেছি। এই পদ্ধতিটি আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। যদিও সেটার স্বপক্ষে আমি নিজেও যুক্তি দেই, হ্যাঁ এটার দরকার ছিল। এটা করতে গিয়ে আমরা যা করেছি সেটা হচ্ছে, আমরা একটা ছাত্রের মেধাকে শুধুমাত্র জিপিএ, সিজিপিএ দিয়ে বিচার করা শুরু করে দিয়েছি।

তাই সবাই কিন্তু একটা জায়গায় প্রতিযোগিতা করছে যা হলো, গোল্ডেন জিপিএ বা সিজিপিএ নিশ্চিত হলো কিনা !! এটা শুধু ছাত্র করছে না, পরিবার করছে না, এটা কিন্তু প্রতিষ্ঠানও করছে। কোন প্রতিষ্ঠানে কয়টা গোল্ডেন জিপিএ, সিজিপিএ পেল সেটা দিয়েই প্রতিষ্ঠানকে বিচার করা হয়। একটি ছাত্র ভালো কি খারাপ তা নিয়ে যত ধরনের নেতিবাচক প্র্যাকটিস আছে সেটা আমাদের দেশে করা হচ্ছে। অদ্ভুত একটা সংস্কৃতি আমরা আত্বস্থ করেছি, একটা সার্টিফিকেট দেওয়াটাই আমাদের কাছে প্রাধান্য হয়ে গিয়েছে। ছাত্ররা তার লব্ধ জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতে কি করবে অথবা তার মধ্যে অন্য কোন ধরণের দক্ষতা রয়েছে কিনা যা তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেই জায়গায় আমরা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এগুতে দিচ্ছিনা। আমাদেরকে এই অচল অবস্থার অবসান করতে হবে। মোটামুটি ভাবে আমি যেটা বলবো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার হতাশা রয়েছে। আমরা কবে শিক্ষাকে সেভাবে জাতীয় ভাবে গুরুত্ব দেবো! শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখবো! যারা মেধাবী তাদেরকে মূল্যায়ন করবো! শিক্ষাঙ্গনে যারা কাজ করবে তাদের সামাজিক মর্যাদা থাকবে!! এটা প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে এবং সর্বোচ্চ পর্যায় বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে। শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত লোকবল, তার আচার-আচরণ, মূল্যায়ন, মূল্যবোধ ইত্যাদি বিবেচনা করে নিরপেক্ষভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবে। আমাদের দেশে শিক্ষাঙ্গনে যে ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড, মাদক, যৌন হয়রানিসহ নানান অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করেছে এই সবগুলো কিন্তু আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রমাণ দিচ্ছে। আমরা ঠিকই দেখছি যে, সমাজে এখনো অনেক ভালো ভালো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে, কিন্তু এই সমস্ত সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্য তারা মূল শিক্ষার জায়গা থেকে সরে আসছে। একটা গাণিতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কে কত জিপিএ বা সিজিপিএ পেল, কিংবা কি সার্টিফিকেট পেল সেটা দিয়ে আমরা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বিবেচনা করছি । এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের হার ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর দায়ভার সরকারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতটুকু নেবে?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : শিক্ষার লক্ষ্য মানসিক বিকাশ ঘটানো এবং একটি ছাত্র তার লব্ধ জ্ঞান দিয়ে যেন ভবিষ্যতে তার নিজের দেশ ও জাতির সাহায্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান আমরা যদি দেখি তাহলে প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ১.২ মিলিয়ন ছাত্র-ছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। দুঃখের বিষয় হলো সবার জন্য আমরা উচ্চশিক্ষার একটা জায়গা এখনো বাংলাদেশে তৈরি করতে পারেনি। আমাদের দেশে অধিকাংশ ভালো ছাত্র-ছাত্রী দেশের সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। প্রায় ৩২ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। একটা ছাত্রকে মানসিক বিকাশের এবং দক্ষ করার জন্য আপনি যে বেকারত্বের হার নিয়ে কথা বলছেন, সেই জায়গাতে আমরা কোনো ভাবেই ফলপ্রসূ হতে পারিনি। দেশে এখন শিক্ষিত অথচ ১৯-২৯ বছরের মধ্যে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ গ্রাজুয়েটই বেকার। এই ধরনের একটা জায়গা আমরা কখনোই বাংলাদেশের জন্য চিন্তা করতে পারিনি। বিশেষ করে আজকে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ভাগ মানুষ তরুণ এবং তারা ৩৫ বছরের নিচে বাংলাদেশের গড় মধ্যম বয়স হচ্ছে ২৬.৭ বছর। আমরা এখন একটি তরুণ জাতি এবং এ জাতিটা আরও ২০-৩০ বছর তরুণই থাকবে। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য দিতে হবে এই তরুণ মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বেরিয়ে আসবে, তারা যেন ভাল কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে। কিন্তু ভাল কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য যে ধরনের ডিগ্রি আমরা দিচ্ছি, সেটা দক্ষতার বিবেচনায় পর্যাপ্ত না এবং সেটা হয়ে গেছে এক ধরনের সার্টিফিকেট প্রদান নির্ভর। স্বচ্ছতার জায়গায় আমরা বিশ্বমানের না। এখন যদি আমরা একটা ছাত্র-ছাত্রীকে শুধুমাত্র বাংলাদেশে চাকরির জন্য প্রস্তুত করার চিন্তা করি তবে আগামী দিনে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। এমনভাবে ছাত্র-ছাত্রী বা গ্রাজুয়েট প্রস্তুত করতে হবে যেন আগামী দিনে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় তারা কাজ করতে পারে অর্থাৎ তারা বাংলাদেশেও কাজ করতে পারে এবং বাংলাদেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারে। সবাইকে শুধু চাকরির সন্ধান করতে হবে সেটা কিন্তু আমি বলছি না। আমরা চাই আগামী প্রজন্মের গ্রাজুয়েটরা তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান দ্বারা, নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প গড়ে তুলবে। নিজেরা নিজেদের কর্মসংস্থান গড়ে তুলবে, এবং কর্মসংস্থান শুধুমাত্র নিজের জন্যই করবে না বরং অন্যের জন্যও করবে। সে নিজেই নিজেকে একজন চাকরী প্রার্থী হিসেবে দেখবেনা বরং কর্মসংস্থান তৈরি করবে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য যাতে অন্যেরা সেখানে কাজ করার সুযোগ নিতে পারে। এগুলো যদি আমরা না ঠিক করতে পারি তাহলে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার আরও বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের দেশের ব্যবস্থাপনার মধ্যস্থতে যত চাকুরী আছে, অন্য দেশ থেকে এখানে এসে অনেকেই এখন সেই স্তরে কিংবা উপরের স্তরে কাজ করছে। এর কারণ হচ্ছে মূলত আমাদের দেশে যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা পাশ করে বের হয়, এরা কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে, তাদের চিন্তা শক্তির বিকাশ এবং কাজ করার দক্ষতা বৃদ্ধির মাত্রা তাদেরকে উপরের মাত্রায় যেতে দেয় না ফলে তারা Decision making পর্যায়ে কাজ করতে পারে না। বিসিএস পাশ করে যারা সরকারি অফিসে কাজ করে তারা নিয়োগ প্রাপ্তির সময় মেধাবী থাকে কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পর এরা অনেকেই কিন্তু আর কর্মক্ষেত্রে ফলপ্রসু অবদান করতে পারেনা এমনকি অনেকে ভাল সিদ্ধান্ত নেবার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বেকারত্বে হ্রাস করতে একটি ছাত্রের প্রয়োজন Analytical frame of mind, Analytical ability, Intellectual capacity, Negotiation skill, Communication skill, Math skill, Forward looking & decision making power, Leadership ability বৃদ্ধি করা। সরকারের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তথা মন্ত্রণালয়, ইউ.ও.জি.সি (UGC) কিংবা Accreditation Council এই বেকারত্বের দায়ভার কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে সেগুলো উত্তরণে করণীয় দিকগুলো আপনি কিভাবে চিন্তা করছেন?

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গেলে, শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রন ও গুন নিয়ন্ত্রন সম্পর্কিত সংস্থাগুলো রয়েছে যেমন- শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা বোর্ড, কারিগরি বোর্ডসহ বিভিন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড, অর্কিডিটিশন কাউন্সিল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ শিক্ষা সম্পর্কিত এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক মানসম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো মুক্ত চিন্তার আলোকে চালাতে হবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষা যেভাবে আছে, সেটা খুবই প্রশাসনিক ভাবে জটিল নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে মনে করি, বর্তমানে যুগোপযোগী ডিগ্রি অফার করতে চাইলে, আগামী প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য যেটা ভালো হবে সেটাই আমাদের করতে হবে। একটা কোর্স কারিকুলাম পাস করতে যদি দুই/ তিন বছর পার হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশ কিন্তু কখনো এগুতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আধুনিক গুণগত শিক্ষা দানের জন্য সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যে সমস্ত বিষয় বা ডিগ্রী অফার করলে বর্তমান তরুণ সমাজের মেধা শক্তির বিকাশ হবে, তার দিকে আমাদেরকে লক্ষ্য দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে যদি দুর্নীতিটা আমরা কোন ভাবে কমিয়ে আনতে না পারি তাহলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কখনও উন্নতি হবে না। আমরা যখন উচ্চ শিক্ষার কথা বলি, আমাদের চিন্তা করতে হয় সরবরাহটা কোথা থেকে আসছে। এদেশের ৬৪ জেলা তথা গ্রাম-গঞ্জ থেকে ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় ধাপে ধাপে উঠে আসে। প্রাইমারি-স্কুল-কলেজ থেকে নিম্নমানের শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ শিক্ষায় আসছে তখন উচ্চ পর্যায়ে ভালভাবে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে না। যে আধুনিক এবং অ্যাডভান্স ডিগ্রি আমরা উচ্চ পর্যায়ে দিতে চাই, তখন এই শিক্ষার্থীরা সেখানে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না অর্থাৎ আধুনিক মানের একটা শিক্ষা নিতে গেলে, শিক্ষক যদি আধুনিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থাকে ছাত্র/ ছাত্রীরা সহজে তা গ্রহন করতে পারে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা একটা সনাতনী ধরনের। আমাদেরকে এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে আমরা সবাইকে এক ধরনের পরীক্ষা পদ্বতি দিয়ে যাচাই-বাচাই করতে পারব। উপরন্তু জেএসসি ও পিএসসি নামে দুটো পরীক্ষা সংযোজন করেছি যার কোন প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর কোন আধুনিক রাষ্ট্রে পঞ্চম কিংবা অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সারা দেশে একদিনে পরীক্ষা নেয়া এ ধরনের কোন প্রথা প্রচলিত নাই। বাচ্চারা এক ধরনের খেলার ছলে যার যার স্কুল থেকে বড় হয়ে অন্য শ্রেণিতে পড়তে যায়। তারপর জাতীয় ভাবে বিভিন্ন ধরনের টেস্ট রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে তারা তাদের মেধার অবস্থান কোথায় আছে তা নির্ণয় করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য হলো বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত চিন্তা করে যে, সবাইকে একই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এক ভাবে, এক প্রশ্ন দিয়ে, সবাইকে পাশ করিয়ে আনতে হবে। এ ধারণাগুলো থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে। তবে আমি এটার উল্টো দিকটাও বুঝি, আমরা যদি উন্নত দেশের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে সকল নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেই, তাহলে এর অপব্যবহার হবে কেননা আমাদের এখনও নিজেদের নৈতিক অবস্থান সেই জায়গায় পৌছে নাই যে, একটি স্কুল নিজেই পরীক্ষা নিয়ে নিজেই রেজাল্ট দিয়ে দিবে। সেই জায়গায় যে রাজনৈতিক প্রভাব, সমাজের প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রন, শিক্ষকদের দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে অন্যায় ও অবিচার ফলে তখন কিন্তু আমরা সব হারিয়ে ফেলবো।

সুতরাং বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে একটা নিয়ন্ত্রন রাখতে হবে, যেটা বোর্ডের মাধ্যমে হলে তা খারাপ কিছু নয়। আর প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে পৃথিবীর কোন উন্নত দেশে নেই বলে বর্জন করতে হবে। এটা আমাদের দেশে মূলত শিক্ষার বাণিজ্যিকী করণ মডেলের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। কোচিং সেন্টার, পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রশ্ন ফাঁস এবং এটার সাথে যে বোর্ড বা যারা জড়িত তাদের একটা আয়ের সুবিধা কিংবা যারা বই লেখেন তাদের আয় বাড়ানোই হলো এর মূল উদ্দেশ্য। ফলাফল ভালো দেখানোর নগ্ন প্রতিযোগীতায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনভাবে জড়িত যে, তারা নিজেরা প্রচার করে পঞ্চম শ্রেণীতে আমরাই প্রথম অথবা অষ্টম শ্রেণীতে আমরাই প্রথম !! পৃথিবীর কোন দেশে এই ধরনের ফার্স্ট বা সেকেন্ড হয়ে আনন্দ-ফূর্র্তি করার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। ভালো স্কুলকে সবাই জানে ভালো হিসেবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন স্কুলের মাঠে ঢোল বাজানো, সাংবাদিকদের নিয়ে ছবি তোলা, ছাত্র-শিক্ষকদের নাচা-নাচি টিভিতে প্রচার করা এগুলোকে মনে হয়, এক ধরনের অপ প্রচেষ্টা। প্রায় প্রতিটি দেশেই বাচ্চাদেরকে নানানভাবে শিক্ষা পদ্ধতির নিম্নস্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা কিন্তু এরকম প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক আনন্দ-ফুর্তি করে দেশব্যাপী নাচানাচি করে না। এতে যারা খারাপ কিংবা যারা মধ্যম মানের ছাত্র, তারা অনেক বেশি বৈষম্যের মধ্যে পড়ে। একটি ছাত্রকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ফল দিয়ে বিবেচনা করা উচিত না বরং প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীকে উৎসাহের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সমীচীন বলে আমি মনে করি। যে ভালো সে প্রকারান্তরে অথবা জীবনের শেষের দিকে এসেও ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়তে পারে। একটা মানুষের মেধার বিকাশ যদি সে কোন না কোনভাবে করতে পারে, যে কোন পর্যায়ে এসে সে নিজের কর্মক্ষেত্র বাছাই করে এগিয়ে যেতে পারে এমনকি সাফল্যের শিখরে পৌছাতে তার বাধায় পড়তে হয় না।

দৈনিক বাঙলার জাগরণ : স্যার, আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি