সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন

সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চান সিনহা রাশেদের মা

নিউজ ডেস্ক : ঘরে ঢুকতেই দেখা নাছিমা আক্তারের সঙ্গে। সোফায় বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর পর আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। মাত্র তিনদিন আগেই ছেলেকে হারিয়েছেন। দেয়ালে টানানো একটা বড় ছবি। কান্না জড়ানো গলায় বললেন, ‘আমার ছেলের ছবি, যখন সে এসএসএফে ছিল। এখন স্মৃতি হয়ে গেছে।’

নাছিমা আক্তার অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের মা। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান সিনহা।

রাজধানীর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে মেজর সিনহার বাড়ি। চারতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় মা নাছিমা আক্তারের সঙ্গে তিনি থাকতেন। মঙ্গলবার সকালে ওই বাড়িতে কথা হয় নাছিমা আক্তারের সঙ্গে। যে কক্ষে তিনি বসেছিলেন, সেটিতে থাকতেন সিনহা রাশেদ খান। ছেলের ঘরটাতেই এখন সময় পার করছেন মা।

সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি মা নাছিমার। তিনি বললেন, ‘কেউ কাউকে এভাবে সরাসরি মারতে পারে না। দাগি আসামিকেও এভাবে মারতে পারে না।’

সিনহা তার পরিবারে একমাত্র ছেলে ছিলেন। তার আর দুজন বোন আছেন। মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার মানিকরাজ এলাকায়। তাদের বাবা মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ খান অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি মারা যান। প্রায় দেড় যুগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে চাকরি করেন সিনহা। বছর দুয়েক আগে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়েন তিনি।

সিনহা ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়। বিশ্ব ভ্রমণ করবেন বলেই তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন বলে জানালেন পরিবারের সদস্যরা।

কক্সবাজারে মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে চেয়েছিলেন

সিনহা কক্সবাজারে যাওয়ার পর প্রায় সময়ই মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন। নাছিমা আক্তার জানালেন, ঈদের তিনদিন আগে তিনি ছেলেকে ফোন করে ঈদ উপলক্ষে বাসায় আসতে বলেন। সিনহা তাকে বলেছিলেন, ডকুমেন্টারি বানানোর কাজ শেষ হয়নি। পরদিন অর্থাৎ ঈদের দুদিন আগে সিনহা মাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আম্মু তুমি কক্সবাজারে চলে আসো। তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে ঈদ করব। বিমানের টিকিট কেটে রাখছি চলে আসো।’ করোনাকালে তিনি কক্সবাজারে যাবেন না বলে ছেলেকে জানিয়ে দেন। এটিই ছিল ছেলের সঙ্গে মায়ের শেষ কথা।

৩১ জুলাই রাত ১১টার দিকে সিনহাকে ফোন করেছিলেন নাছিমা আক্তার। রিং বাজলেও কেউ ফোন ধরেননি। নাছিমা বলেন, ‘ফোনে রিং বাজলেও ছেলে ফোন ধরেনি। ব্যস্ত ছিল ভেবে ফোন রেখে দিই। এর আনুমানিক আধা ঘন্টা পর একজন ফোন করে আমাকে। জানতে চান, সিনহা আমার কে হয়। সিনহা কোথায় কী করে এসব জানতে চান ওই ব্যক্তি। আমার ছেলে সম্পর্কে এভাবে প্রশ্ন করায় আমি একটু রাগান্বিত হই। এরপরই ওই প্রান্তে থেকে বলেন, ‘আপনি এমন করছেন কেনো, আমি টেকনাফ থানার ওসি। আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার ছেলের কী হয়েছে? আমার ছেলে কী আপনার কাছে আছে? ফোনটা দেন। ওসি বলেন, দূরে আছে। পরে দেবো বলে তিনি ফোন রেখে দেন। এরপর ছেলেকে আমি ফোন দিই, রিং বাজে, কিন্ত কেউ ফোন ধরেনি।’

বিশ্ব ভ্রমণের ইচ্ছা

সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস জানান, তার ভাই অন্য রকম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন। সুযোগ পেলেই বই পড়তেন। বিশ্ব ভ্রমণের ইচ্ছে ছিল। যে কারণে সিনহা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়েন। চাকরি ছাড়ার পর থেকেই ভ্রমণ পরিকল্পনা করছিলেন। বিশ্ব ভ্রমণের সবকিছু তিনি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেবেন এমন পরিকল্পনা করেছিলেন। চীন থেকে বিশ্ব ভ্রমণ শুরু করার পরিকল্পনা ছিল সিনহার। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে গিয়ে সাইকেল কিনে ঘুরবে। চীন থেকে নেপালে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার ছোটবোন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারহা ফারজানা ফেরদৌস তাকে বলেন, তিনি দেশে আসবেন। তাই ভ্রমণে বের হতে নিষেধ করেন। জানুয়ারিতে বোন দেশে আসেন এবং চলেও যান। এরই মধ্যে করোনায় লকডাউন শুরু হওয়ায় সিনহার আর ভ্রমণে বের হওয়া হয়নি। মার্চে রাজশাহী যান বেড়াতে।

সিনহার মা বলেন, ‘রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরে সিনহা আমাকে বলে, আম্মু চীনে যেহেতু যাওয়া হচ্ছে না। ঘরে বসে কী করব, আমি কক্সবাজারে যাব ডকুমেন্টারি বানাতে। আমি সম্মতি দিয়েছিলাম। কাজের মধ্যেই ছিল আমার ছেলে।’

জন্মদিনে ছেলের কাছে চকলেট

গত ২৬ জুলাই সিনহার জন্মদিন ছিল। তার মা বলেন, ‘অনলাইনে একটি চকলেট বক্স কিনে আনাই। কক্সবাজারে যে রিসোর্টে আমার ছেলে ছিল, সেই ঠিকানায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চকলেট পাঠিয়ে দিই। পরে ফোনে ছেলেকে ফোন করে বলি, বাবা তোমাকে চকলেট পাঠিয়েছি, পেয়েছো? কাজের কারণে তুমি খাওয়ার সময় পাও না। কাজের ফাঁকে চকলেট খেও, এনার্জি পাবা।’

‘টর্চলাইট জ্বালিয়ে পাহাড়ে বই পড়ত’

সিনহার মা নাছিমা বলেন, ‘ছেলেকে বলেছিলাম, তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত। সামনে প্রমোশন হবে। তুমি চাকরি ছাড়বা কেন? ওর কোনো ইচ্ছায় আমি বাধা দেইনি। বললাম, তুমি যেটা ভালো মনে করো, সেটিই করো। ওর কোনো কাজে বাধা দিতাম না। অ্যাডভাঞ্চার-প্রিয় ছিল। পরিকল্পিত সুন্দর জীবন ছিল। পাহাড় পছন্দ করত। প্রকৃতি পছন্দ করত। সৈকত পছন্দ করত। প্রচুর বই পড়ত। কক্সবাজারের হিমছড়িতে কোথায় বসে বই পড়তো সেই ছবিও আমাকে পাঠিয়েছে। টর্চলাইট জ্বালিয়ে পাহাড়ে বই পড়ত।’

নাছিমা বলেন, ‘সিনহা অত্যন্ত মেধাবী ছিল। ছিল আত্মবিশ্বাসী। খারাপ কোনোকিছু কখনো দেখিনি। আমার ছেলের জীবনটা ছিল ভালোলাগার জায়গা। এখানে অর্থ বা অন্য কিছু না। শুধু ভালোলাগা।’

‘সে বিয়ে করেনি। আমিও তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনি কখনো। কেন বিয়ে করো না, কেন জঙ্গলে ঘোরো -এসব কখনও আমি জানতে চাইনি তার কাছে। ও আমাকে বলত, আমি ভাগ্যাবান, আমার আম্মু আমার ফিলিংসটা বোঝে। আম্মু কখনো আমাকে পেইন দেয়নি,’ বলেন নছিমা।

সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি

সিনহার পরিবারের সদস্যরা বলেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করেন তারা। সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার বিচার চাই।’

একই দাবি করেন আমেরিকা প্রবাসী ছোটো বোন ফারহা ফারজানা। সিনহার মা নাছিমা বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিচার হতে হবে।’ সিনহা সিগারেট পর্যন্ত টানতেন না বলে জানান তার মা।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি