রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন

নারী নির্যাতন শুধু সামাজিক ব্যাধিই না : তাহেরা বেগম জলি

নারী নির্যাতন শুধু সামাজিক ব্যাধিই না, এটা এক ধরণের বিকৃত যৌন আগ্রাসনও। নির্যাতন ক’রে বিকৃত যৌন সুখ অনুভব করা। আমার শুরুর জীবন থেকে আজ পর্যন্ত নারী নির্যাতন কমেছে,এমন দেখিনি। বরং তা বেড়েছে এবং নিত্য নতুন পদ্ধতিতে। নারী সমাজের উপর আজকাল শুধু নির্যাতনই করা হয় না। ভয়াবহ সব নির্যাতন প্রদর্শন করে তারিয়ে তারিয়ে তা উপভোগ করা হয়। সামান্য যে অধিকার নারী সমাজের আজ আয়ত্বে, তা অনেকটা যুদ্ধ জয়ের ইতিহাসের মতো। উল্লেখ করবার মতো আছে নারীসমাজের লেখাপড়া করবার অধিকার, তা সত্যিই এক দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ফল। এই সেদিনের কথা,বেগম রোকেয়া-অবলা বসুদের মত অভিজাত নারী,তাঁদের সর্বস্ব ছেড়ে পথে প্রান্তরে ছুটেছেন নারীর শিক্ষার অধিকার আদায়ের জন্য। মহান বিদ্যাসাগর বলতে গেলে বিদ্রোহই করে বসলেন নারী সমাজের কল্যান সাধন করতে গিয়ে। তারপরও এমন এক ইঞ্চি জমিও পাওয়া যাবেনা,যেখানে নারীসমাজ নিরাপত্তা অনুভব করেন।

গত এক সপ্তাহ ধরে মহারানী লক্ষ্মীবাঈকে নিয়ে পুরোনো ইতিহাসে ডুবে ছিলাম। অদ্ভুতভাবে সেখানেও দেখলাম,নারী দমনের সেই কুৎসিত আদিম কৌশলের পথেই হেঁটেছেন ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী। মেজর এলিস,যার মত্‌ ছিলো রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের প্রতি আর একটু সহনীয় হওয়া উচিৎ। আর যায় কোথায়, একদল ব্রিটিশ জান্তব পুরুষ অমনি ঝাঁপিয়ে পড়লো লক্ষ্মীবাঈ এবং মেজর এলিসের উপর। তাঁদের দু’জনকে নিয়ে লেখা হয়ে গেলো রমরমা প্রেমের গল্প। গিলিয়ানের লেখা ‘দি রানী’ এবং MeadowsTaylor এর লেখা ‘সীতা’ খোদ ব্রিটেনেও প্রত্যাখ্যাত হয়। আমি স্যালুট জানাই ব্রিটিশ জনগণকে। কারণ মহারানীকে নিয়ে এই কুৎসিত আয়োজন তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ এই মেজর এলিসের সঙ্গেও রক্তাক্ত লড়াইয়ে নামতে হয়েছে মহারানীকে। মেজর জেনারেল হিউরোজ, রানী লক্ষ্মীবাঈকে মোকাবেলা করতে বিশেষভাবে নিয়োগ দিয়ে ব্রিটেন থেকে যাকে ডেকে আনা হয়েছিলো ভারতবর্ষে। এবং যার সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে মহান সেই অগ্নিকন্যা নিহত হন। সেই মেজর হিউরোজ মহারানীকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন, “Although a lady, She was the bravest and best military leader of the rebels. A man among the mutineers. “নারী হলেও তিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহসী সামরিক নেতা। বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ।” ঝাঁসির রানীকে এখানে টেনে আনলাম এজন্য যে, নারীর প্রতি আক্রমণ বা যৌন আগ্রাসন চালানো সনাতন এবং আদিম পদ্ধতি।

নারীকে সরাসরি শকুনের খাদ্যে পরিণত করতে না পারলে, তাকে সামাজিক ভাবে নগ্ন ক’রে দাও,এটা একটা সামাজিক শিক্ষাই। নারীরা কী পরলো, কী খাওয়া দাওয়া করছে, কোথায় যাচ্ছে-কীভাবে যাচ্ছে এই সমস্ত অলস প্রতিহিংসাপরায়ন ভাবনা পুরুষ সমাজের মাথা অর্ধেক দখল করে আছে। নইলে তারা দেখতে পেতো তাদেরই ঔরসজাত কন্যা সন্তান আজ কী নির্মম নির্যাতনের মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অবশ্য এই দেখতে না পাওয়ার পিছনে তাদের একটা দ্বিমুখী অন্তরজ্বালা কাজ করে। একদিন পুরুষ হয়ে নারীর জন্য যে অত্যাচার অন্যায়ের বেড়াজাল তারা রচনা করেছে, আজ বাবা বা ভাই হয়ে নিজের তৈরি সেই নির্যাতনের সনদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কীভাবে! ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় তৎকালীন ভারতবর্ষীয় পুরুষ সমাজ সতীদাহ আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলো। আর বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনকে ধ্বংস করবার জন্য সাধ্যমত সবরকম চেষ্টাই করেছে তৎকালীন ভারতবর্ষীয় পুরুষ। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবন বাজী রাখা সেই মহাযজ্ঞের সামনে মাথা তাদের নত করতেই হয়েছে।

নারী নির্যাতন আমাদের দেশে দিনে দিনে মহীরুহ আঁকার ধারণ করেছে। আমাদের বাবা এবং ভাইয়েরা যদি একটু নিজের দিকে ফিরে তাকাতে পারতেন, (যদিও শুধুমাত্র বাবা ভাই হলেই মানুষ হওয়া যায় না) তবে এ সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, নারী নির্যাতনের অর্ধেক সমাধান দিতে পারে। অথচ নির্মম সত্য যে কথা বলে, এই ব্যাপারে আমাদের পুরুষ অভিভাবক সম্প্রদায় সেই বিদ্যাসাগর রাম মোহনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো পুরুষ সমাজই রয়ে গেছেন। সম্ভবত তারা চিন্তা করেন, সম্পদ কেন নারীর অধিকারে যাবে? হোক সে কন্যা বা ভগিনি। তারপরও সে নারী। নারী নিজেই তো পন্য। বাজারে নিয়ে যা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। যখন তখন নির্যাতন করা যায়, ইচ্ছা মনে করলে যখন তখন হত্যাও করা যায়। দিব্যি দেখা যাচ্ছে এ সংকট নিরেট সামাজিক। তাই আমাদেরও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় নারী বা পুরুষ সকলের সমস্যাই সামাজিক। যেকোনো জনগোষ্ঠী নিয়ে আন্দোলনও তাই বিশেষ কোন গোষ্ঠীর নয়। তা নারী পুরুষ সকলের।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি