মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৭:২২ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা বিষে বাংলাদেশ : প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে-রিন্টু আনোয়ার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চুক্তি-বিচার সব ডেমকেয়ার করে চলছে মিয়ানমার। একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে না নেয়ার গোঁ ধরার মতো অবস্থানে তারা। আন্তর্জাতিক আদালতে হেরে যাওয়া বা ভর্তসনায় তারা একটুও লজ্জিত নয়। বরং চুরির ওপর শিনাজুরির মতো হাসছে কূটনৈতিক বিজয়ের হাসি। তারওপর করোনা মহামারি তাদের জন্য বাড়তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য চীন ও রাশিয়া শুরু থেকেই মিয়ানমারের পক্ষে। আমেরিকা এমন কি বন্ধু রাষ্ট্র কৌশলে নীরব দর্শকের গ্যালারিতে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢল আছড়ে পড়ার তিন বছর শেষে তাদের মতিগতি আরো পরিস্কার। মিয়ানমার যেন বাংলাদেশকে আচ্ছা মতো পেয়ে বসেছে।

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ই-আলোচনায় আমাদের পররাষ্ট্রসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক তদারকিতে রাখাইনে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাস্তবটা কিন্তু অন্যরকম। চাপের বদলে মেনে নেয়া, সয়ে যাওয়ার নেপথ্য চেষ্টা-তদ্বিরও ব্যাপক।

গত তিন বছরে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী চাপ দিয়েছে মিয়ানমারকে? এ প্রশ্নের জবাব খুজলে হতাশই হতে হবে। সস্তা কথায় সাধারণ মানুষকে গোঁজা বুঝ দেওয়া যায়। কিন্তু, বুঝদারদের নয়। তারা জানেন, নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। ভেটো ক্ষমতার অধিকারী নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়াকে রাজি করাতে না পারলে নিরাপত্তা পরিষদে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আশা করা যায় না। চীন ও রাশিয়া সম্মত না হলেও এ ধরনের প্রস্তাবে তাদের ভেটো দেওয়া থেকে বিরত রাখার কোনো চেষ্টাও কি হয়েছে?

আন্তর্জাতিক বিশ্বের অন্য যারা মাঝেমধ্যে মিয়ানমারকে টুকটাক চাপ দিতো তারাও করোনাকালে ব্যস্ত অন্য কিছু নিয়ে। রোহিঙ্গা তথা বাংলাদেশের এই জনগোষ্টিকে সামলানোর দুর্গতি নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুসরত পাচ্ছে না। বাংলাদেশের লবি, দেন-দরবার, তদ্বিরও থমকে গেছে। এই সুযোগে কূটনীতির মারপ্যাঁচে কোনঠাসা না হয়ে জবরদস্তিই করে যাচ্ছে মিয়ানমার। আর দমে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাখাইনে গত কিছুদিন ধরে যে বিধ্বংশী অভিযান ও নিষ্ঠুরতা চলছে তা নিয়ে টু শব্দও হচ্ছে না।

এবার ২৫ আগস্টে সরবে তৃতীয় ‘রোহিঙ্গা জেনোসাইড রিমেম্বার ডে’ পালন করেনি রোহিঙ্গারা। এর আগে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বড় আকারে সমাবেশ আয়োজন, মসজিদে মসজিদে দোয়া, ব্যানার ফেস্টুন, টি শার্ট ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক পরিসরে দিনটি পালন করে বিশ্বগণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে রোহিঙ্গারা। এবার করোনা পরিস্থিতি দৃষ্টে সেই ধরনের কিছুতে যায়নি তারা।

রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা সোসাইট ফর পিস অ্যান্ড হিউমিনিটি- এআরএসপিএসের নেতাদের মতিগতি রহস্যজনক। টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা সংগঠন ভয়েস অব রোহিঙ্গা, স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক, রোহিঙ্গা ইয়ুথ ফর লিগ্যাল অ্যাকশন, রোহিঙ্গা ইয়ুথ ফেডারেশন, রোহিঙ্গা কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম, এডুকেশন ফর রোহিঙ্গা জেনারেশন, রোহিঙ্গা ওমেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস ইত্যাদি সংগঠন বেশ তৎপর।

অসহায় হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব কেটে গেছে আরো আগেই। এরা এখন পরাক্রমশালী। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক-অস্ত্র ব্যবসা, মানবপাচারসহ নানা অপকর্মে এরা লিড করছে। গত তিন বছরে বিভিন্ন থানায় দেড় হাজারের মতো মামলা হয়েছে তাদের নামে। অপকর্মের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে ক্রসফায়ারে খরচ করে দিতে হচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিরাও বেশ নির্ভর করছে তাদের ওপর। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছেও বেশ সমাদর। রাখাইনে ধাওয়া খেয়ে কক্সবাজারে আছড়ে পড়ার পর স্থানিয় পর্যায়ে শুরু হওয়া সহযোগিতা এখন বিশ্বপরিসরেও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাদের এখন বহু হিতাকাঙ্খি। চতুরমুখী আশার্বাদে রোহিঙ্গাদের অপকর্ম এখন আর ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা আশপাশে সীমিত নয়। এক সময় তাদের প্রতি যাদের সহমর্মীতা-ভালোবাসা কাজ করতো তারাও তিন বছরের ব্যবধানে কেবল তাজ্জব নয়, আক্রান্তও।

দেশে দফায় দফায় ঠাঁই নেয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে ব্যয়ের জোগান আসছে। এছাড়া ত্রাণ বা সহায়তা বাবদ রোহিঙ্গাদের পেছনে দাতা গোষ্ঠী বা অন্য কোনও সূত্র থেকে আর্থিক সহায়তা আসছে। সেখান থেকে কিছু এদিক-সেদিক হচ্ছে। এর বাইরে রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার ব্যয় দেখাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে গত তিন বছরে রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের সরাসরি ব্যয়ের পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি টাকা।

এই বিশাল টাকা নিয়ে নানা কাহিনী ও ঘটনা ঘটছে। হিসাব ও টার্গেট বুমেরাং হয়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চেষ্টায় নামে সরকার। শুরুতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলো যেমন আসিয়ান, ভারত, চীন, কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিলসহ অন্যান্য যেসব মেকানিজম আছে সব জায়গায় ধরনা দিয়েছে। কিন্তু, চেষ্টার যোগফল অনুকূলে নয়।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের অবস্থান ও সংখ্যা নিয়েও ভেতরে-ভেতরে গোলমাল যাচ্ছে। বলা হয়ে আসছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় নেয়ার কথা। তাদের প্রায় ৯ লাখ এসেছে ২০১৭-এর আগস্টের পরে। এর আগে ২০১৬ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অপারেশন শুরু করলে ও ২০১২ সালে রাখাইনে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হলে অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৯২ সালে যে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যেও ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কিন্তু, সবার ঠিক-ঠিকানা মিলছে না। প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই-বাছাই করতে সরকার পাঁচ দফায় আট লাখ ৫৩ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমার সরকারকে দিয়েছিল।

প্রথম দফায় আট হাজার ৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৮৪ জনের। দ্বিতীয় দফার ২২ হাজার ৪৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই হয়েছে মাত্র চার হাজার ৬৫০ জনের। অর্থাৎ সাড়ে আট লাখের মধ্যে ১০ হাজারেরও যাচাই বাছাই শেষ করেনি মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ অঞ্চল বা সেফ জোন প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে বাংলাদেশ যে স্পষ্ট এবং জোরালো অবস্থান তুলে ধরতে পারেনি। সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবেও কেন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা গেল না?

সাধারণ পরিষদে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে যে প্রস্তাব পাস হয়, তার পক্ষে ভোট পড়েছিল ১৩৪ এবং বিপক্ষে ৯। ভোটদানে বিরত ছিল ২৮টি দেশ। রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ, সহিংসতার নিন্দা এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তাবেও ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন আদায় করা যায়নি। এ ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার (আঞ্চলিক জোট আসিয়ানভুক্ত) দেশগুলোর মধ্যে বিশেষত বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোও প্রস্তাবটিতে সমর্থন দেয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সই করা বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক অকার্যকরই হয়ে আছে।

একজন উদ্বাস্তুরও প্রত্যাবাসন হয়নি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় ও মানবিক জীবনযাপনের জন্য যে পরিমাণ অর্থের সংস্থান প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সহায়তা ক্রমেই কমছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজে গাম্বিয়ার আবেদনের শুনানি করে গণহত্যা সনদের বিধানের আলোকে মিয়ানমারে এখনো যেসব রোহিঙ্গা রয়ে গেছে, তাদের সম্ভাব্য গণহত্যা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেছেন। সেই আদেশ বাস্তবায়নে দেশটি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার ওপর প্রথম প্রতিবেদনটিও গত মে মাসে আদালতের কাছে জমা পড়েছে। আইসিজের রায় বাংলাদেশের জন্য কিছুটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

আইসিজেতে প্রতিবেদন দেওয়ার ঠিক মাস দেড়েক আগে গত ৮ এপ্রিল জাতিসংঘের গণহত্যা সনদ মেনে চলা এবং রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সব সহিংসতার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের জন্যও দেশটির প্রেসিডেন্ট এক নির্দেশনা জারি করেন। নির্দেশনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ধ্বংস করা হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রাখাইন রাজ্যে এখনো নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনেও রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়নি। অথচ আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

দেশে বিরোধীমত দমন-পীড়ন, ম্যানেজ, কেনাবেচা ও বিতর্কিত নির্বাচনে সরকার যতো সচেষ্ট ছিল রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তার সামান্য কূটনৈতিক চেষ্টা করলেও চিত্র ভিন্ন হতে পারতো বলে অনেকের বিশ্বাস। দেশিয় রাজনীতিতে বিশেষ করে বিরোধিমত দমন, নানা ঘটনা ধামাচাপায় সরকার যে মাত্রায় সফল, ঠিক সেই মাত্রায় ব্যর্থ হয়ে চলছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষও বুঝতে পারছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি জটিল হবে, তা দিবালোকের চেয়েও পরিস্কার।

লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি