বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৩:২০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

মেয়ে মানুষ এবং মানুষ : তাহেরা বেগম জলি

ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা একজন মহাকাশচারী। প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিনের ৬১সালে মহাকাশের যাত্রী হওয়ার পর, ২৪ বছরের যুবতী ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন মহাকাশে পাড়ি জমান। মহাকাশচারী প্রথম দু’জনই সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার গর্বিত সদস্য। ভ্যালেন্তিনা মহাকাশে অবস্থান করেছিলেন ২ দিন ২২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। ভস্তক ৬ এ বসে ৪৮ বার তিনি কক্ষপথ পরিভ্রমন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন কমিউনিস্ট জামানা। ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় সংগঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার বীর এবং দুইবার ‘অর্ডার অব লেনিন’ পুরস্কারে ভূষিত হন মহান এই নারী। সৌখিন প্যারাসুট আরোহী তেরেস্কোভা মোট ১২৬ বার প্যারাসুট নিয়ে বিমান থেকে খোলা আকাশে লাফিয়ে পড়েন। ১৯৫৯ সালের ২১ শে মে ২২ বছর বয়সে প্রথম তিনি প্যারাসুট নিয়ে হাজার হাজার মাইল উপরে আকাশে ঝাপ দেন।

মহাকাশচারী হিসেবে তিনি ২য় এবং নারী মহাকাশচারী হিসেবে তিনি ১ম মানুষ। ১৯৯৭ সালে মেজর জেনারেল পদমর্যাদা অর্জন ক’রে বিমান বাহিনী থেকে অবসরে যান কমরেড ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা। সম্প্রতি তিনি মঙ্গলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এবং সেখান থেকে ফিরে আসতে না পারলেও। তিনি বর্তমানে ৮৩ বছর বয়সের একজন নারী। গর্বিত নারীমানুষ তিনি। নারীদের মহাকাশ ভ্রমন এখন খুবই পুরোনো কাহিনী। বর্তমানে এটা নিত্য ঘটনা। ভারতীয় যুবতী কল্পনা চাওলা বেশ কয়েক বছর আগে, ছয়জন মহাকাশচারীর সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসবার সময় মৃত্যু বরণ করেন, বীরত্বপূর্ণ এ কাহিনী নিশ্চয় ভুলে যাইনি আমরা।

এবার আসি আমাদের নিম্নস্তরের কুরুচিপূর্ণ গালগপ্প নিয়ে। সাবরিনা কতবড় অপরাধ করেছে তা এড়িয়ে আমাদের চোখ চলে যায় ওর পোশাক বা তার বিয়ের সংখ্যা নিয়ে। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আমাদের আলোচনায় চলে এসেছে যশোরের নারী বাইক আরোহী ফারহানা। একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনে,নিজের মত ক’রে উৎসবের আয়োজন করেছেন,এবং সেখানকার অসংখ্য মানুষ সে উৎসব উপভোগও করেছেন। মাঝখান থেকে কিছু বিকৃত মানুষের তা ভালো লাগেনি। অমনি তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো বাইক আরোহী স্বাধীন মেয়েটার উপরে। তবে বিকৃত এই কিছু মানুষ আমাদের জন্য কোন সমস্যা নয়। সমস্যা ওদের এই নারী আক্রমণের সুযোগ যে আমরাই ক’রে দিয়েছি এবং দিচ্ছি এটা। যেমন ৭১ সালের রাজাকারদের আমরা বিচার করতে পারলাম না। উল্টো রাজাকার এবং পাক হানাদারের হাতে সম্ভ্রম হারানো লক্ষ লক্ষ যুদ্ধনারীদের দেশ থেকে হাসতে হাসতে তাড়িয়ে দিলাম। এবং সেই নির্মমতা নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে কেউ সামান্য শব্দ পর্যন্ত করলো না! ধর্ষক লালন পালনের প্রথা আমাদের সেই যে চালু হোলো তার ক্ষত আমরা এখনো বয়ে চলেছি।

সমাজ উল্টো পথে হাঁটলে যে সমস্যা হয়,আমরা পড়েছি সেই সমস্যায়। এখানে খুনি ধর্ষকের বিচার হয় না। লুটপাটকারীরা অবাধে লুটপাট করে। এবং সমাজের মাথা তারাই। মাদক কারবারির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র আমাদের দেশ। আমাদের দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ নারীকে পাচার ক’রে দেওয়া হয়েছে দেশের বাইরে। সৌদি বিশ্বে বাপ বেটা মিলে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে আমাদের নারীদের। তার কোন সুরাহা নেই। কোটি কোটি বেকার যুবকের অনিশ্চিত জীবনের হাহাকারে ছয়লাব হয়ে আছে দেশটা। আমাদের সমাজে মানুষকে নষ্ট করবার হাজারটা রাস্তা খোলা আছে। কিন্তু প্রকৃত মানুষ হিসেবে দাঁড়ানোর সকল রাস্তাই এখানে বন্ধ। স্বাভাবিক কারণেই এখানে নারী শিশুর জীবন বিপন্ন হবেই। শোষণের স্বার্থে মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তিকে এখানে জাগিয়ে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। মাঝখান দিয়ে দুই একজন যে ভালো কথা বা ভালো কাজ করছেন না তা নয়। কিন্তু বদ্ধ জলাশয়ে অমৃত ঢেলে দিলেও যেমন তা পঁ’চে দুর্গন্ধ বের হয়,এখানেও তাই হচ্ছে। কোন কোন নিরীহ ভদ্রলোকের দুই চারটা ভালো কথা অনেকটা উপহাসের মতো শোনাচ্ছে আমাদের কানে। বাস্তবে এখন আমাদের দরকার অমানবিকতার বিরুদ্ধে মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠার আছড়ে পড়া জোয়ার।

১৯৬৩ সালে ২৪ বছরের একজন মেয়ে মহাকাশে আড়াইদিন কাটিয়ে এলো। ২০২০ সালে বসে আমরা একজন মেয়ের মটর বাইক চালিয়ে গায়ে হলুদে যাওয়া নিয়ে কুৎসিত আলোচনায় মশগুল! আমরা তো মানবিক উন্নতির শিখরে বাস করছি!

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি