বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈ ছিলেন একজন নারী : তাহেরা বেগম জলি

১৮৫৭ সালের কথা। মরোপান্তে তাম্বে এবং ভাগীরথী কন্যা মণিকর্ণিকা ততোদিনে বিঠুর থেকে এসে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও নেভালকরের সিংহাসনের পাশের আসনে বসে মহারানী লক্ষ্মীবাঈ হিসেবে আত্ম প্রকাশ করেছেন। তবে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা মনিকর্নিকার ঝাঁসি পূর্ব জীবনে একটু ঘুরে আসবো। বিঠুরের রাজা ২য় বাজিরাওয়ের রাজ পুরোহিত ছিলেন মরোপান্তে তাম্বে। মাতৃহারা মণিকর্ণিকা রাজা বাজিরাওয়ের স্নেহ এবং প্রশ্রয়ের ছায়ায় অনেকটা স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠেন।

অপার এই স্নেহের প্রতিদান হিসেবেই মণিকর্ণিকার জীবনে বাসা বেঁধেছিলো ইংরেজ বিরোধী স্বভাব। বিদ্রোহী স্বভাবটাকে শানিয়ে নেবার অনুকুল পরিবেশও হাতের নাগালে ধরা দিয়েছিলো দুরন্ত এই শিশুর। ইংরেজের করদ রাজ্য বিঠুরের উপর ফিরিঙ্গী অনাচারে বিষিয়ে উঠেছিলো ছোট্ট মণিকর্ণিকার মন। তার কচি হৃদয় কেবলই আতিপাতি ক’রে বেড়াতো এর প্রতিকারের।

প্রতিকারের প্রস্তুতি হিসেবে প্রাসাদ চত্তরেই গোলা বারুদ এবং তলোয়ারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন ভারতের ভবিষ্যৎ অগ্নিকন্যা মণিকর্ণিকা। এবং তাঁর ফিরিঙ্গী বিরোধী যাত্রা সেখান থেকেই শুরু। অতঃপর রাজাসনে বসার অল্পদিন পরেই ইংরেজ শাসকের সঙ্গে এক অমীমাংসিত বিরোধে জড়িয়ে পড়েন রাজবধু লক্ষ্মীবাঈ। মহারানী যেন অপেক্ষায় ছিলেন ইংরেজের মুখোমুখি দাঁড়াবার। ভারতের তৎকালীন গভর্নর লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ সালের ১২ই জানুয়ারি ক্ষমতা হাতে নিয়েই “Doctrine of lapse” শিরোনামে একটা আইন জারী করেন।

যার বনিয়াদে ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য গুলোতে ঘোষণা করা হয়, প্রকৃত উত্তরাধিকারী না থাকলে রাজ্যগুলো চলে যাবে ব্রিটিশের দখলে। এই সূত্রেই মহারানী লক্ষীবাঈ ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে এক আপসহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে মহারানী লক্ষীবাঈ হারিয়েছেন তাঁর তিনমাসের একমাত্র পুত্র দামোদর রাও এবং স্বামী মহারাজা গঙ্গাধর রাওকে।

রানীর কাছে প্রস্তাব আসে তাঁকে মাসোহারা দেওয়া হবে। তাঁর জীবনের কোন ছন্দপতন হবে না। কিন্তু তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। স্বামীর জীবিতাবস্থায়ই মহারানী একজন পুত্র সন্তান দত্তক নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজকার্য পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। তাঁর কাছে যখন ইংরেজের প্রস্তাব আসে,সরাসরি তিনি বলে দেন “আমার ঝাঁসি আমি দেবো না।” স্বাধীনতাপ্রিয় লক্ষ্মীবাঈয়ের পক্ষে সম্ভবই ছিলো না ইংরেজের এই অপমানজনক প্রস্তাব মেনে নেওয়া।

আইনের রাস্তায় হেঁটে বিফল হয়ে তাই তিনি বেছে নেন যুদ্ধের পথ। যদিও আক্ষরিক অর্থেই সে ছিলো এক অসম যুদ্ধ। রানীর যুদ্ধ ঘোষনার শুরুতেই,জেনারেল হিউরোজকে নিয়োগ দিয়ে ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে আনা হয়। সিপাহী বিদ্রোহের আগুনে তখন জ্বলছে গোটা ভারতবর্ষ। দিল্লি রীতিমত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ঘুম হারাম ক’রে দিয়েছে।

সেই চড়াই উৎরাই যখন কিছুটা থিতিয়ে এসেছে,ঠিক তখনই লক্ষীবাঈয়ের ধরিয়ে দেওয়া আগুনে নতুন ক’রে জ্বলে ওঠে ঝাঁসি গোয়ালিয়র আর কাল্পি। মহারানী লক্ষীবাঈয়ের বিদ্রোহের চুড়ান্ত সময়কাল ছিলো ১৮৫৮ সাল। আমরা অদ্ভুতভাবে এখানেও লক্ষ্য করি,এরকম একটা জীবন মরণ যুদ্ধও সাক্ষী হয়ে আছে নারী বিদ্বেষী কালিমার। মহারানীর সহযোদ্ধা তাঁতিয়া টোপি ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে সামান্য হলেও নিজেদের কৃতকর্ম স্বীকার করে গেছেন। তিনি বলেছেন,”রানীকে সহযোগিতা করলে আমাদের ভাগ্য আজ অন্যরকম হতে পারতো।

সময় থাকতে ইচ্ছাকৃত যা আমরা অবহেলা করেছি।” আর সরাসরি প্রতিপক্ষ জেনারেল হিউরোজ-যুদ্ধের ময়দানে মহারানীর সেই দুঃসাহসিক এবং তাঁর অভূতপূর্ব যুদ্ধ পরিচালনার কাহিনী নিজের বয়ানেই প্রচার ক’রে গেছেন। মহারানী সেই যুদ্ধেই সম্মুখ সমরে মৃত্যুবরণ করেন। এবং তিনি নিশ্চিত জানতেন,মৃত্যু তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে। আজ এখানে বলে যাই,মহারানী তখন ছিলেন ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সের একজন যুবতী। শুধু ইংরেজের কাছে মাথা নোয়াবেন না বলে সেই শিশুকালেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন তলোয়ার আর বন্দুক। তিনি জানতেন এই অসম যুদ্ধে মৃত্যুই তাঁকে বরণ ক’রে নিতে হবে।

যুদ্ধবাজ জেনারেল হিউরোজ তৎকালীন সমস্ত আধুনিক সমরাস্ত্র এবং যুদ্ধ শৃঙ্খলা নিয়েই ঢুকেছিলেন ভারতবর্ষে। মহারানীর যা পুরোটাই জানা ছিলো। মহারানীর এটাও জানা ছিলো এই যুদ্ধে মৃত্যুই তাঁর প্রধান পরিনতি। যুদ্ধের ময়দানে তাই তিনি এই ব’লে সৈন্যদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন,”ফিরিঙ্গী মারো এবং নিজেরা মরো।” ভারতবর্ষের অন্ধকারের আলো মহারানী লক্ষীবাঈ,সেই অসম যুদ্ধে জ্বলে উঠেছিলেন নিজের জীবনের আগুনেই। এবং তিনি ছিলেন একজন নারী। যে নারী আজও ভারতবর্ষ সহ আমাদেরও পথ দেখায়, কীভাবে আত্মসম্মান নিয়ে জীবন প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি