শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

মানব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডিমের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ভূমিকা -ড. নাথু রাম সরকার ও মো. আতাউল গনি রাব্বানী

ডিমের খাদ্যমান ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জনসাধারণকে মানুষকে অবহিত করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত ডিম উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ভোক্তার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডিম অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ায় ভিয়েনায় ‘ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন’-এর সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ পালিত হয়। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পোল্ট্রি গবেষণার অন্যতম তীর্থস্থান বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোল্ট্রি সেক্টরের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই দিবসটি পালন করে আসছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ দিবসটি পালনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ প্রতি বছর এ দেশে অসংখ্য শিশু ও গর্ভবতী মা পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। দেশের অভুক্ত ও পুষ্টিহীনতার শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিমানসম্পন্ন নিরাপদ আমিষের অন্যতম উৎস-ডিম সহজলভ্য করার জন্য দিবসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ অপুষ্টির শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে, যার প্রায় ৩৫ শতাংশই শিশু। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা (এফএও), শিশু তহবিল ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির উদ্যোগে ‘বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি বাস্তবতা ২০১৯’ অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৮২ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এর মধ্যে ৫১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ এশিয়ার এবং ২৫ কোটি ৬১ লাখ মানুষ আফ্রিকায় বসবাস করে। বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণিসম্পদ সেক্টরের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। তাঁর নির্দেশনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, বিএলআরআই, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে খাদ্য নিরাপত্তাসহ পুষ্টি নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে খর্বাকার (stunted) শিশুর সংখ্যা ৩১%, যা ২০১১ সালে ছিলো ৪১%। অনুরুপভাবে, উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের (wasted) শিশুর সংখ্যা ২০১১ সালে ১৬% থাকলেও ২০১৮ সালে তা কমে ৮ শতাংশ হয়েছে। তাই, অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিমকে স্থান দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ভিশন ২০২১-এ দেশের ৮৫ ভাগ লোকের জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের নিশ্চয়তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে। মাথাপিছু সাপ্তাহিক ডিমের চাহিদা ২টি হিসেবে বর্তমানে দেশে বার্ষিক ডিমের চাহিদা ১৭৩২.৬৪ কোটি। আশার কথা হচ্ছে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হয়েছে ১৭৩৬.৪৩ কোটি। অর্থ্যাৎ, বিশ্ব জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) নির্ধারিত জন প্রতি বছরে ১০৪টি ডিম গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে। তবে, উন্নত বিশ্বের মতো বছরে গড়ে মাথাপিছু ২৫০টির অধিক ডিম গ্রহণের জন্য ডিমের উৎপাদন অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই এবং সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

ডিম এমনি একটি প্রাকৃতিক খাদ্য যা মানুষের জন্য দরকারি সব পুষ্টিগুণে ভরপুর। একটি সম্পূর্ণ ডিমে (৫০গ্রাম) প্রায় ৬ গ্রাম মানসম্মত প্রোটিন, ৫ গ্রাম উন্নত ফ্যাটি এসিড, ৭০ থেকে ৭৭ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৭৫ থেকে ২১২ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল, ১০০ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম কালিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপকরণ থাকে। প্রাকৃতিক এই অনন্য খাদ্য উপাদান ডিম নিয়ে সাধারণ মানুষ এমনকি উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে ভুল ধারণা, যা আমাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে অনেক বড় বাধা। ডিমের রয়েছে রোগ-প্রতিরোধী ও জীবন রক্ষাকারী নানা ধরণের পুষ্টি উপাদান।

কোলেস্টেরলের ভূমিকা: ৫০ গ্রামের একটি ডিমে রয়েছে প্রায় ২১২ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল। কোলেস্টেরলের নাম শুনেই অনেকে ডিম খাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু শরীরের সুষ্ঠু ও পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল দরকার। খাদ্যের মাধ্যমে কোলেস্টেরল মানব শরীরের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় না। তবে, শতকরা ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে বিশেষ করে যাদের বংশগত ‘হাইপার কোলেস্টেরিমিয়া’ রোগ আছে। মানবদেহের লিভার বা যকৃত প্রতিদিনই যথেষ্ট পরিমাণ কোলেস্টেরল উৎপন্ন করে, কাজেই ডিম খেলে যকৃত কিছুটা কম পরিমাণ কোলেস্টেরল উৎপন্ন করে। দুই ধরনের কোলেস্টেরলের একটি হলো HDL (High Density Lipoprotein) আর অন্যটি LDL (Low Density Lipoprotein)। HDL কে বলা হয় ‘ভালো কোলেস্টেরল’ আর খউখ কে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’। বেশি করে ডিম খেলে রক্তে LDL এর পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে ‘হার্ড ডিজিজ’ তথা হৃদপিন্ডের অসুখসহ অনেক জটিল রোগের প্রবণতা কমে যায়। LDL এর মধ্যে আবার দু’টি ভাগ রয়েছে। ছোট ও ঘন কণার LDL ও বড় কণার LDL । রক্তে বেশি মাত্রার ছোট ও ঘন কণার LDL এর উপস্থিতি মানেই ‘হার্ড ডিজিজ’ তথা হৃদপিন্ডের অসুখের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, ডিম যদি কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে LDL এর পরিমাণ বাড়িয়েও দেয় তবে সেটি ছোট ও ঘন কণার LDL থেকে দ্রুতই বড় কণার LDL -এ রুপান্তরিত হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ।

ভিটামিন ও কোলিনের ভূমিকা: দিনে দুইটি করে ডিম খেলে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের জন্য দরকারি প্রতিদিনের মোট ভিটামিনের চাহিদার প্রায় ১০% থেকে ৩০% পূরণ হয়। কারণ ডিমে ভিটামিন-সি ছাড়া প্রায় সব ধরণের ভিটামিনই রয়েছে। ডিমে ভিটামিনি-সি না থাকার অন্যতম কারণ হলো, বিভিন্ন পোল্ট্রি প্রজাতি তাদের খাদ্যের গ্লোকোজ থেকে ‘ডি-নভো সিনথেসিসি’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের জন্য দরকারি ভিটামিন-সি নিজেরাই তৈরী করে থাকে। তাছাড়া, হাজার বছর আগে বন্য পরিবেশ থেকে গৃহপালিত অবস্থায় চলে আসার কারণেও পোল্ট্রির বিভিন্ন প্রজাতিগুলোতে ভিটামিন-সি উৎপাদনের দক্ষতাও পরিবর্তন হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন। যাইহোক, ডিমের কুসুমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, বি১, বি২, বি৫, বি৬, বি৯ এবং বি১২। আর ডিমের সাদা অংশে (এ্যালবুমিন) সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভিটামিন বি২, বি৩, ও বি৫; এছাড়াও থাকে বি১, বি৬, বি৮, বি৯ এবং বি১২। ডিমের কুসুমে রয়েছে মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূরণ পুষ্টিউপাদান-কোলিন (৬৮০মিলিগ্রাম প্রতি ১০০ গ্রাম ডিমের কুসুমে), যা মানুষের ব্রেন ও হাড়ের পরিপূর্ণ গঠন ও উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ধরণের স্নায়ুবিক তথ্য আদান-প্রদানসহ শরীরের বিভিন্ন কোষের বৃদ্ধি ও উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া, ডিমে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন-এ রয়েছে যা রাতকানা ররাগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

খনিজ পদার্থ (মিনারেল) ও সূক্ষ উপাদানগুলোর ভূমিকা: ডিমে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, আয়রনসহ প্রায় সব ধরনের বড় এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খনিজ উপাদানই পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে (সারণি-১)। নিয়মিত ডিম খেলে এসব খনিজ উপাদানের ঘাটতিজনিত রোগ যেমন বিষন্নতা, অবসাদ, ক্লান্তি প্রভৃতি প্রতিরোধসহ নানা জটিল রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

সারণি-১: ডিমের কুসুম ও ডিমের সাদা অংশসহ একটি সম্পূর্ণ ডিমে বিদ্যমান খনিজ (মিনারেল) উপাদানের পরিমাণ (মিলিগ্রাম/১০০গ্রাম)
পুষ্টি উপাদানের নাম সম্পূর্ণ ডিম ডিমের কুসুম ডিমের সাদা অংশ (এ্যালবুমিন)

(উৎসঃ ইউএসডিএ ন্যাশনাল ডাটাবেজ ফর স্টান্ডার্ড রেফারেন্স, রিলিজ-২৭; ফ্রান্স এজেন্সি ফর ফুড, এনভায়রমেন্ট এন্ড অকুপেশনাল হেলথ্ এন্ড সেফটি; ২০১৯)

এন্টি-অক্সিডেন্ট উপাদানের ভূমিকা: ডিমে বিভিন্ন ধরণের এন্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ক্যারোটিনয়েড, ওভোট্রান্সফারিন, ওভোমিউসিন, ওভোমিউকয়েড হাইড্রোলাইসেট, ওভোমিউসিন হাইড্রোলাইসেট, ফসভিটিন অন্যতম। এসব এন্টি-অক্সিডেন্ট মানুষের পোষ্টিক তন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী অসুখ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

বায়োএ্যাকটিভ কম্পোনেন্ট/উপাদান ও এন্টিমাইক্রোবিয়াল প্রোটিন কণার ভূমিকা: ডিম শুধু বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানেরই উৎস নয়, এতে রয়েছে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অনন্য উপকারি কিছু বায়োএ্যাকটিভ উপাদান। এসব উপাদান মানুষের পাকস্থলির অম্লত (পিএইচ) কম রাখাসহ খাদ্য হজমের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন অনুজীবের কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। ডিমের কুসুম ও সাদা অংশে (এ্যালবুমিন) বিভিন্ন ধরণের এন্টিমাইক্রোবিয়াল প্রোটিন কণা থাকে। এসব এন্টিমাইক্রোবিয়াল প্রোটিন কণা বিভিন্ন উপায়ে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বাহ্যিক আবরণ ভেদ কওে সেগুলোকে মেরে ফেলে। এছাড়াও, সংক্রমণকারী কিছু অনুজীব আছে যেগুলো মানব শরীরে বিভিন্ন সংক্রমণ ঘটানোর জন্য আয়রণ ও ভিটামিন দরকার হয়, কিন্তু ডিমের এন্টিমাইক্রোবিয়াল প্রোটিন কণা ওইসব অনুজীবের অত্যাবশ্যকীয় রসদ সরবরাহে বাঁধা দেয় সেগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। সেই সঙ্গে মানুষের অন্ত্রের/পোষ্টিক তন্ত্রের বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণুর (এনটারিক প্যাথোজেন) মাধ্যমে ঘটিত সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

ক্যান্সাররোধী উপাদান ও রোগপ্রতিরোধ তরান্বিতকারী উপাদানের ভূমিকা: ডিমের সাদা অংশ (এ্যালবুমিন)-এর লাইসোজাইমের ক্যান্সাররোধী ক্ষমতা রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছেন। এছাড়া, অন্ত্রের পীড়াদায়ক রোগের (ইনফ্লামেটরি বোভেল ডিজিজ) চিকিৎসার ক্ষেত্রেও লাইসোজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডিমের মিউসিন, চ্যালাজা ও কুসুমের আবরণের প্রোটিওলাইসিস থেকে উৎপন্ন সালফেট গ্লাইকোপেপটাইড বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকর অনুজীব নষ্ট করতে সহায়তা করে। ওভোমিউসিন ও এটি থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পেপটাইড, ট্রাইপেপটাইড, হাইড্রোলাইটিক পেপটাইড প্রভৃতি কোষের প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে ডিমের ভূমিকা: বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি মানুষ নানা কারণে উচ্চ রক্তচাপজনিত (হাইপারটেনশন) সমস্যায় ভুগছেন। দীর্ঘমেয়াদী রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সোডিয়াম, পটাসিয়াম নিয়মিত গ্রহণ করা এবং ‘রেনিন-এনজিওটেনসিন-এ্যালডোস্টেরন’ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা। ‘এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম (এসিই) নামে এক ধরণের এনজাইম রয়েছে যেটি এনজিওটেনসিন-ও কে সক্রিয় ভ্যাসোকনসট্রিকটর এনজিওটেনসিন-ওও এ রুপান্তর করার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ঘটাতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু, ওভোট্রান্সফারিন, এ্যালবুমিনের হাইড্রোলাইসেটসহ ডিমের কুসুম ও ডিম থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পেপটাইডযাদের এন্টি-হাইপারটেনসিভ ক্ষমতা রয়েছে, এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম (এসিই)-এর বিরুদ্ধে কাজ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণসহ হৃদপিন্ডের নানাবিধ অসুখ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

এছাড়াও, ডিমের প্রোটিনে রয়েছে মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব সঠিক মাত্রার এমাইনো এসিড যা অতিরিক্ত ওজন কমাতে সহায়তা করার পাশাপাশি রক্তসঞ্চালন, দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধনে সহায়ক। ডিমের কোলিন মস্তিস্ক কোষ গঠন ও সিগনালিং সিস্টেমে কাজ করে মানুষের স্মরণশক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। ডিমের কুসুমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ লিউটিন ও জিয়াজেন্থিন যা চোখে ছানি পড়াসহ রেটিনার কর্মক্ষমতা ক্ষয় সংক্রান্ত অসুখ ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ প্রতিরোধ করে দৃষ্টিশক্তিকে উন্নত করে।

তাই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০২১ সালের মধ্যে ‘মধ্যম আয়ের দেশ’, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসইউন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’ অর্জন এবং ২০৪১সালেরমধ্যে ‘উন্নতসমৃদ্ধদেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের জন্য জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তার পাশপাশি পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এসব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস-ডিম এর উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে পোল্ট্রি ও পোল্ট্রিজাত বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বিস্তর গবেষণার পরিধি আরোও বাড়াতে হবে। প্রায় ৬০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী দেশীয় বিকাশমান পোল্ট্রি শিল্প ও এর সঙ্গে জড়িত সব খামারি, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী, গবেষক সবাই মিলে এক সঙ্গে কাজ করলে এই সেক্টরের আরোও উন্নয়ন ঘটবে। এছাড়াও, গবেষণার ফলাফল ও এই সেক্টরের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমস্যার আলোকে বিজ্ঞানী, গবেষক, স¤প্রসারণকর্মী, নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ডিমের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে প্রচার- প্রচারণা আরোও বাড়াতে হবে।

লেখকদ্বয়: ড. নাথু রাম সরকার, মহাপরিচালক ও মোঃ আতাউল গনি রাব্বানী, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা-১৩৪১।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি