মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন

পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করা প্রসঙ্গ ডিএসই শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের মতবিরোধ

দেশে চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৫ এপ্রিল। ওই সময়ের পর ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হলে আবারো পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করা হবে কিনা সে বিষয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ফলে ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলে পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করা হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো সমন্বিত সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না এক্সচেঞ্জটি।

প্রসঙ্গত, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ ২৫ মার্চের পর থেকেই। বিশ্বের অন্যত্র চালু থাকলেও সমন্বিত অটোমেটেড সিস্টেম না থাকায় বাংলাদেশে এখন লেনদেন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর তিন শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, শাকিল রিজভী ও মোহাম্মদ শাহজাহান সরকারি সাধারণ ছুটি যতদিন বহাল থাকবে, ততদিন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ রাখার পক্ষে। অন্যদিকে ডিএসইর আরেক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মো. রকিবুর রহমান পুঁজিবাজারে সীমিত পরিসরে হলেও লেনদেন চালু রাখার পক্ষে। এ বাস্তবতায় এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজার চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি ডিএসইর পর্ষদ।

পুঁজিবাজার চালুর বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আইনিভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে অনেক ভবন লকডাউন করা হয়েছে, যেখানে ব্রোকারেজ হাউজের অফিসও রয়েছে। তাছাড়া ছুটির মধ্যে সীমিত আকারে ব্যাংকের লেনদেন চালু থাকায় স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিদিন ৩০০-৪০০ কোটি টাকার লেনদেন করা সম্ভব নয়। ডিএসইর লেনদেন অটোমেটেড হলেও এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে পারেনি। মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে মোট বিনিয়োগকারীর মাত্র দশমিক ৫২ শতাংশ লেনদেন করছে। তাছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাংকে চেকের মাধ্যমে অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় বর্তমানে ঘরে বসে লেনদেন চালু রাখা সম্ভব নয়।

জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বড় নয়, বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে অনেক ব্যবসা করা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালক শাকিল রিজভী। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করা প্রয়োজন হলেও আমাদের সে ধরনের সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ লেনদেন চালু রাখতে হলে ম্যাচিং ইঞ্জিন চালু রাখতে হবে। এজন্য ২০-২৫ জন কর্মীকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে। তাছাড়া ব্রোকারেজ হাউজগুলো চালাতে আরো কর্মীর প্রয়োজন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রোকারেজ হাউজের কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাই স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন চালু না রাখাই উত্তম হবে।

ডিএসইর আরেক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, জীবনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। সাধারণ ছুটির সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম বন্ধ রাখা সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের লেনদেন বন্ধ রাখার বিষয়ে মত দিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট শরীফ আনোয়ার হোসেনও। তিনি বলেন, সাধারণ ছুটির কারণে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর অনেক কর্মীই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। তাছাড়া এরই মধ্যে অনেক এলাকা লকডাউন হয়ে গেছে এবং প্রতিদিনই লকডাউন হওয়া এলাকার সংখ্যা বাড়ছে। ফলে চাইলেও অনেকের পক্ষে লকডাউন উপেক্ষা করে ব্রোকারেজ হাউজে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া ডিএসই অটোমেটেড হলেও এখনো সেভাবে বিনিয়োগকারীরা অভ্যস্ত নন। ফলে মহামারীর এ সময়ে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ব্রোকারেজ হাউজে আনা কি ঠিক হবে?

এদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে হলেও সীমিত পরিসরে পুঁজিবাজারে লেনদেন চালুর পক্ষে ডিএসইর আরেক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মো. রকিবুর রহমান। চাইলেই সীমিত পরিসরে সীমিত জনবল দিয়ে ব্রোকারেজ হাউজ চালু রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। তার মতে, বিশ্বায়নের এ যুগে যেখানে সব প্রায় সব দেশেই পুঁজিবাজার চালু রয়েছে, সেখানে আমরা বন্ধ রাখতে পারি না। তাছাড়া এ পরিস্থিতিতে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারীর জরুরি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় তারা শেয়ার বিক্রি করে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না।

এদিকে সিডিবিএল চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির এমডি শুভ্র কান্তি চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জ যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব। তারা লেনদেন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই আমাদের অফিসও বন্ধ রয়েছে। তারা লেনদেন চালু করলে আমরাও অফিস চালু করতে পারব। আমাদের সে সক্ষমতা রয়েছে।

একই কথা বলছেন বিএসইসির কর্মকর্তারাও। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান জানান, স্টক এক্সচেঞ্জ পুঁজিবাজার চালুর সিদ্ধান্ত নিলে তখন আমরা সার্ভিল্যান্স বিভাগ চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব কমিশনের কাছে আসেনি।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে শেয়ার বিক্রি করে অর্থ উত্তোলন করতে পারেন, সেজন্য সীমিত পরিসরে হলেও পুঁজিবাজারে লেনদেন চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিএসইসির সাবেক দুই চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরশেনস সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান সাধারণ ছুটি প্রলম্বিত হলেও পুঁজিবাজার চালুর পক্ষে।

অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে স্টক এক্সচেঞ্জ চালু রাখা যায় কিনা, সেটি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখছে বলে জানিয়েছেন এক্সচেঞ্জটির চেয়ারম্যান মো. ইউনূসুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবেদন পেলে তখন পুঁজিবাজার চালু রাখা সম্ভব হবে কিনা, এ বিষয়ে পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেবে। পর্ষদের সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজার চালুর অনুকূলে গেলে তখন এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মতামত চাওয়া হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি